রিয়াজ উদ্দিন| কক্সবাজার
তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২০ সালের ইয়াবা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন। মূলত অন্য এক ব্যক্তি সোনা মিয়ার পরিচয় ব্যবহার করে মামলায় আসামি হয়েছিলেন বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত এ বিষয়ে আদেশ দেন বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান।
আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কারাগারে থাকা সোনা মিয়াকে মুক্তির ক্ষেত্রে চারটি শর্ত দেওয়া হয়েছে। শর্তগুলো হলো—কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার আইডি কার্ড জমা দিতে হবে, প্রতি সপ্তাহে থানায় হাজিরা দিতে হবে, কোনোভাবেই দেশত্যাগ করা যাবে না এবং প্রতি তিন মাস পরপর আদালতে হাজির হতে হবে।
একই সঙ্গে মামলার প্রকৃত আসামিকে দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং আদালতে সোপর্দ করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালের ২ মার্চ। ওই দিন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। মামলার এজাহারে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে ‘সোনা মিয়া’র নাম উল্লেখ করা হয়। পিতার নাম নজির আহমদ, বর্তমান ঠিকানা কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া এবং স্থায়ী ঠিকানা রামুর গর্জনিয়া উল্লেখ করা হয়েছিল।
পুলিশের তদন্তে পরে ওই নাম-ঠিকানা সঠিক পাওয়া যায়নি। তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রে বিষয়টি উল্লেখ করেন।
নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ জুন ওই ‘সোনা মিয়া’ কক্সবাজার জেলা জজ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান। এরপর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। দীর্ঘ সময় পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওই মামলায় পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়।
রায়ের পর ২৩ জুন র্যাব-১৫-এর একটি ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে ‘সোনা মিয়া’কে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে যাওয়ার দুই-তিন দিন পর তিনি জেল সুপারের কাছে আবেদন করে জানান, তিনি ওই মামলার আসামি নন।
এরপর বিষয়টি আদালতের নজরে এলে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। গত ২ জুলাই পুলিশ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে।
পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া দ্বিতীয় আসামির প্রকৃত নাম ছিল রমজান। তিনি নিজেকে ‘সোনা মিয়া’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন এবং সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধনের কপি ব্যবহার করেছিলেন বলে তদন্তে জানা যায়। রমজান ও সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করতেন এবং পরে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে অবস্থান করতেন বলে পুলিশের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি ও ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার শারীরিক ও পারিবারিক তথ্যেও বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া গেছে। আগের নথিতে স্ত্রী, সন্তান, উচ্চতা, ওজন ও শরীরের শনাক্তকারী চিহ্নের যে তথ্য ছিল, পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার তথ্যের সঙ্গে সেগুলোর মিল নেই।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান বলেন, মামলার শুরু থেকেই তদন্তে গুরুতর গাফিলতি ছিল। পুলিশের অভিযোগপত্রেই যখন আসামির নাম-ঠিকানা সঠিক নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছিল, তখন সেই পরিচয় যাচাই না করে কীভাবে জামিন দেওয়া হলো—এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, আদালতের আদেশের পর দ্রুত সময়ের মধ্যে সোনা মিয়া কারাগার থেকে মুক্তি পাবেন।
সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, তার স্বামীর আগে কোনো মামলা ছিল না এবং তিনি কখনো কারাগারেও যাননি। রোহিঙ্গা রমজানের সঙ্গে পরিচয়ের কারণে তার স্বামীর পরিচয় ব্যবহার করে ইয়াবা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, দীর্ঘ তদন্তে সোনা মিয়ার নাম ব্যবহার করে রমজান নামের এক ব্যক্তি ‘আয়নাবাজির’ ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। আদালতের বুধবারের আদেশের কপি এখনও থানায় পৌঁছেনি। আদেশ হাতে পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে—একজনের পরিচয় ব্যবহার করে অন্য ব্যক্তি কীভাবে এত বছর ধরে একটি গুরুতর মাদক মামলার আসামি হিসেবে আদালতের নথিতে থেকে গেলেন এবং সেই পরিচয়েই কীভাবে জামিন ও পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হলো। একই সঙ্গে প্রকৃত আসামি শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্তের দুর্বলতাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
All rights reserved © 2026 DailyRupaliSaikat.Com
Developed By : AZAD WEB IT