রিয়াজ উদ্দিন ।কক্সবাজার
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান যখন আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় ফেরার সম্ভাবনা তৈরি করছে, ঠিক তখনই নতুন করে নিজেদের পুরোনো অবস্থান সামনে আনল মিয়ানমার। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে দেওয়া দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বিবৃতি শুধু প্রত্যাবাসন নিয়ে বক্তব্য নয়—এর মধ্যে রয়েছে পরিচয় অস্বীকার, সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের বয়ান প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট চেষ্টা।
বিবৃতিতে মিয়ানমার বলেছে, রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাদের পরিচয় যাচাই করা যাবে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব মিয়ানমারে নেই বলেও দাবি করেছে দেশটি। বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে থাকা জনগোষ্ঠীকে ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে নেপিদো।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি সত্যিকার অর্থে প্রত্যাবাসনের নতুন উদ্যোগ, নাকি পুরোনো কৌশলকে নতুন ভাষায় সামনে আনার চেষ্টা?
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ক্যাম্পে থাকা সবাইকে মিয়ানমারের নাগরিক বা রাখাইনের বাসিন্দা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, ‘রোহিঙ্গা’ নামে যে পরিচয় ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি মিয়ানমারে স্বীকৃত কোনো জাতিগত পরিচয় নয়।
বিবৃতিতে ২০১৬ ও ২০১৭ সালের সহিংসতার জন্য আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি—আরসাকে দায়ী করা হয়েছে। মিয়ানমারের দাবি, আরসার হামলার পর তাদের বাহিনী ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ পরিচালনা করে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক ‘বাঙালি’ বাংলাদেশে চলে যায় বলে দাবি করেছে দেশটি।
তবে এই ব্যাখ্যায় মিয়ানমার সামরিক অভিযানের সময় রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও জাতিগত নিধনের অভিযোগের কোনো দায় স্বীকার করেনি।
মিয়ানমারের বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, ২০১৭ সালের ঘটনার আগে বুথিদং, মংডু ও রাথিডং এলাকায় সাত লাখ ৪০ হাজারের বেশি ‘বাঙালি’ বসবাস করত। তাদের হিসাব অনুযায়ী, সংঘাতের পর দুই লাখের বেশি সেখানে থেকে যায় এবং প্রায় পাঁচ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশে চলে আসে।
এই হিসাবের ভিত্তিতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচলিত তথ্যের সঙ্গেও দ্বিমত জানিয়েছে মিয়ানমার।
অন্যদিকে বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ বলে আসছে, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হলেই রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব।
মিয়ানমারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যে আট লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা দিয়েছে, তার মধ্যে ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত চার লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে।
এর মধ্যে তিন লাখ আট হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। চার হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এক লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছে মিয়ানমার।
এই যাচাই-বাছাইয়ের কাঠামো নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা। কারণ অতীতেও তালিকা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে প্রত্যাবাসন কার্যত এগোয়নি।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এবারও পরিচয় ও যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়টিকে সামনে রেখে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করা মিয়ানমারের জন্য নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির রাষ্ট্রীয় বয়ানে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে যাওয়া জনগোষ্ঠী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
কিন্তু এই পরিচয়গত অবস্থানের রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের একটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে তাদের নাগরিকত্বের দাবিও দুর্বল করার সুযোগ তৈরি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বিবৃতিতে মিয়ানমার মূলত দুটি বার্তা দিতে চেয়েছে—প্রথমত, তারা কিছু মানুষকে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী; দ্বিতীয়ত, সেই প্রত্যাবাসন হবে মিয়ানমারের নির্ধারিত পরিচয় ও শর্তের ভিত্তিতে।
অর্থাৎ, ‘রোহিঙ্গা হিসেবে প্রত্যাবাসন’ নয়, বরং ‘রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাইকৃত ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসন’—এই কাঠামো প্রতিষ্ঠার চেষ্টা রয়েছে বিবৃতিতে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমারের ওপর চাপ রয়েছে। জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন দেশ রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়ে আসছে।
এই প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের নতুন বিবৃতিকে নিজেদের অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, প্রত্যাবাসনে আগ্রহ দেখানোর মাধ্যমে মিয়ানমার একদিকে আন্তর্জাতিক চাপ কিছুটা মোকাবিলা করতে চাইছে, অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে নিজেদের বয়ানকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে।
বিবৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি এখানেই—রাখাইনে ফিরে যাওয়া মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
মিয়ানমার বলেছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে যাচাই হওয়া ব্যক্তিদের গ্রহণ করা হবে। কিন্তু সেই নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, প্রত্যাবাসিতদের নাগরিক অধিকার কী হবে, তাদের চলাচলের স্বাধীনতা থাকবে কি না, বসতভিটা ও সম্পত্তির অধিকার কীভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট কোনো রূপরেখা নেই।
আর এখানেই আগের প্রত্যাবাসন উদ্যোগগুলোর ব্যর্থতার সঙ্গে নতুন বিবৃতির যোগসূত্র খুঁজছেন বিশ্লেষকরা।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য ২০১৭ সালের পর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একাধিক সমঝোতা হয়। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও একজন রোহিঙ্গাকেও স্থায়ীভাবে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।
কারণ হিসেবে সামনে এসেছে নিরাপত্তাহীনতা, নাগরিকত্বের অনিশ্চয়তা, পরিচয়ের স্বীকৃতি না থাকা এবং নিজ ভূমিতে অধিকার ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তার অভাব।
রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশের আশঙ্কা ছিল—তাদের ফিরিয়ে নিয়ে আবারও যদি নির্দিষ্ট শিবিরে আটকে রাখা হয়, তাহলে প্রত্যাবাসন তাদের জন্য স্থায়ী সমাধান হবে না।
মিয়ানমারের নতুন বিবৃতিতে প্রত্যাবাসনের আগ্রহের কথা থাকলেও বাস্তবে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পরিবেশ কতটা তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, বিবৃতিটি একেবারে উপেক্ষা করার মতো নয়। কারণ দীর্ঘ সময় পর মিয়ানমার আবারও প্রকাশ্যে যাচাই হওয়া ব্যক্তিদের ফেরত নেওয়ার কথা বলেছে। ফলে কূটনৈতিক আলোচনার নতুন একটি দরজা খুলতে পারে।
তবে অন্য অংশের আশঙ্কা, পরিচয় ও সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক সামনে এনে প্রত্যাবাসনের মূল বিষয়—নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার—আড়ালে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
মিয়ানমারের বিবৃতির বিষয়ে বাংলাদেশ এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে ঢাকার সামনে এখন দুটি বিষয় একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একদিকে প্রত্যাবাসনের বাস্তব সুযোগ তৈরি হলে তা কূটনৈতিকভাবে কাজে লাগানো; অন্যদিকে মিয়ানমারের এমন কোনো শর্ত মেনে না নেওয়া, যা রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও মৌলিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
কারণ প্রত্যাবাসন মানেই শুধু সীমান্ত পেরিয়ে মানুষকে ফেরত পাঠানো নয়। প্রত্যাবাসন তখনই টেকসই হবে, যখন ফেরত যাওয়া মানুষ নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, বসতভিটা, জীবিকা এবং মর্যাদার নিশ্চয়তা পাবে।
মিয়ানমারের নতুন বিবৃতিকে এক বাক্যে ব্যাখ্যা করতে গেলে বলা যায়—দরজা খোলার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু দরজার চাবি রাখা হয়েছে মিয়ানমারের নিজের হাতে।
ফেরত নেওয়ার আগ্রহ দেখানো হয়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গে রোহিঙ্গা পরিচয় অস্বীকার করা হয়েছে। প্রত্যাবাসনের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। যাচাই করা ব্যক্তিদের ফেরত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু যাচাইয়ের মানদণ্ড ও প্রক্রিয়া নিয়ে রয়ে গেছে বড় প্রশ্ন।
তাই মিয়ানমারের এই বিবৃতি একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ভাঙার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি রোহিঙ্গা সংকটের মূল প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রত্যাবাসনের আলোচনা যদি এবার সত্যিই এগোয়, তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—শুধু মানুষ ফেরত পাঠানো নয়, এমন একটি প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা, যাতে তারা আবারও বাস্তুচ্যুত না হয়।
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান শেষ পর্যন্ত সংখ্যার হিসাব কিংবা পরিচয়ের বিতর্কে নয়; সমাধান নির্ভর করবে নিরাপদ প্রত্যাবাসন, অধিকার ও মর্যাদার নিশ্চয়তার ওপর।
All rights reserved © 2026 DailyRupaliSaikat.Com
Developed By : AZAD WEB IT