
রিয়াজ উদ্দিন, কক্সবাজার
কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার প্রক্রিয়ায় নতুন প্রশাসনিক সীমানা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত সম্প্রসারিত সীমানায় কক্সবাজার পৌরসভার পাশাপাশি রামু ও কক্সবাজার সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি ইউনিয়ন পুরোপুরি এবং একটি ইউনিয়নের নির্দিষ্ট কিছু মৌজা নতুন সিটি কর্পোরেশনের আওতায় আসবে।
এ লক্ষ্যে প্রস্তাবিত সম্প্রসারিত এলাকা ও কক্সবাজার পৌরসভার সার্বিক তথ্য-উপাত্ত সংবলিত একটি প্রশাসনিক প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রদান করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে নতুন সিটি কর্পোরেশনের সম্ভাব্য আয়তন, জনসংখ্যা ও অন্তর্ভুক্ত এলাকার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
১৬৯.৬৪ বর্গকিলোমিটারে হবে নতুন সিটি কর্পোরেশন
বর্তমানে প্রায় ৩২.৯০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের কক্সবাজার পৌরসভাকে সম্প্রসারণ করে প্রস্তাবিত সিটি কর্পোরেশনের মোট আয়তন নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬৯.৬৪ বর্গকিলোমিটার।
প্রস্তাবিত সীমানায় কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল, পিএমখালী ও ঝিলংজা এবং রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ও খুনিয়াপালং ইউনিয়ন অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
এর মধ্যে—
খুরুশকুল ইউনিয়ন: ২৩.৬৭ বর্গকিলোমিটার
পিএমখালী ইউনিয়ন: ২৭.২৫ বর্গকিলোমিটার
ঝিলংজা ইউনিয়ন: ২০.০০ বর্গকিলোমিটার
দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়ন: ১৮.০০ বর্গকিলোমিটার
খুনিয়াপালং ইউনিয়ন: ৪৭.৮২ বর্গকিলোমিটার
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী দক্ষিণ মিঠাছড়ি, খুনিয়াপালং, খুরুশকুল ও পিএমখালী ইউনিয়ন পুরোপুরি সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে ঝিলংজা ইউনিয়নের পুরো এলাকা নয়, নির্দিষ্ট কিছু মৌজা নতুন সীমানার মধ্যে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
জনসংখ্যা ছাড়াবে ১০ লাখ
প্রশাসনিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জনশুমারি হিসাবে প্রস্তাবিত সম্প্রসারিত এলাকার জনসংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৮ হাজার ৭২৭ জন। তবে বর্তমানে এসব এলাকায় জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রস্তাবিত সীমানার মোট জনসংখ্যা আনুমানিক ১০ লাখ ৮০ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ জনসংখ্যা নিয়ে কক্সবাজার পৌরসভা পরিচালিত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে তথ্য দেওয়া হয়েছে। ফলে পৌরসভা ও প্রস্তাবিত সম্প্রসারিত এলাকার সমন্বয়ে কক্সবাজারের নতুন নগর প্রশাসনিক কাঠামো দেশের অন্যতম বড় জনবহুল সিটি কর্পোরেশন হিসেবে গড়ে উঠতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
পর্যটননগরীর পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা
কক্সবাজার দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটননগরী। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক দেশি-বিদেশি পর্যটক এখানে আসেন। পর্যটন শিল্পের পাশাপাশি আবাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ ও নগরায়নের বিস্তার ঘটছে শহরের আশপাশের ইউনিয়নগুলোতেও।
বিশেষ করে খুরুশকুল, পিএমখালী, ঝিলংজা, দক্ষিণ মিঠাছড়ি ও খুনিয়াপালংয়ের বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক বছরে বসতি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বর্তমান পৌরসভার সীমিত সীমানার বাইরে বিস্তৃত নগরায়নকে একটি সমন্বিত প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
নগরসেবা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা
প্রস্তাবিত সিটি কর্পোরেশন বাস্তবায়িত হলে সম্প্রসারিত এলাকার বাসিন্দাদের জন্য নগরভিত্তিক বিভিন্ন সেবা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সড়ক উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ, পানি সরবরাহ, আলোকায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, নগর পরিকল্পনা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তবে সিটি কর্পোরেশনের সীমানা সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিশাল জনসংখ্যার জন্য পর্যাপ্ত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা, অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিকল্পিত নগরায়ন নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
প্রশাসনিক প্রতিবেদনে কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর
প্রস্তাবিত সম্প্রসারণের এসব তথ্য কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসনিক নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। নথিতে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রোমেল বড়ুয়া, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আদনান চৌধুরী এবং প্রশাসক মো. শামীম আল ইমরানের স্বাক্ষর রয়েছে।
প্রশাসনিক প্রতিবেদনে বর্তমান পৌরসভার তথ্যের পাশাপাশি প্রস্তাবিত সম্প্রসারিত এলাকার আয়তন, ইউনিয়নভিত্তিক বিবরণ ও জনসংখ্যার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
এখন বাস্তবায়নের অপেক্ষা
কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে শুধু প্রশাসনিক কাঠামোই বদলাবে না, বদলে যাবে কক্সবাজারের নগর ব্যবস্থাপনার পরিধিও। শহরের সঙ্গে আশপাশের দ্রুত বর্ধনশীল এলাকাগুলোকে একই নগর ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে প্রস্তাবিত সীমানা চূড়ান্ত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যাচাই-বাছাই ও সরকারি অনুমোদনের বিষয়টি সম্পন্ন হতে হবে। সেই প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে কক্সবাজারের নগরবাসী।
প্রস্তাবিত সীমানা বাস্তবায়িত হলে ৩২.৯০ বর্গকিলোমিটারের বর্তমান কক্সবাজার পৌরসভা বিস্তৃত হয়ে দাঁড়াবে ১৬৯.৬৪ বর্গকিলোমিটারের একটি বৃহৎ নগর প্রশাসনিক এলাকায়—যেখানে বসবাস করবে আনুমানিক ১০ লাখ ৮০ হাজার মানুষ।
All rights reserved © 2026 DailyRupaliSaikat.Com
Developed By : AZAD WEB IT