বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫২ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার:
পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ মীমাংসা করে দেওয়ার কথা বলে এক নারীকে কক্সবাজার শহরের একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করার অভিযোগ উঠেছে খুরুশকুলের বিএনপি নেতা ও সমাজ কমিটির সভাপতি সিকান্দর আলীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী বাদী হয়ে কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এ মামলা করেছেন। আদালত অভিযোগটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার ফৌজদারী দরখাস্তে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
আদালতে দাখিল করা দরখাস্ত সূত্রে জানা যায়, বাদী পারভীন আক্তার (৩৮) কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের রুচ্ছুলার ডেইল এলাকার বাসিন্দা। একটি পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধের সমাধানের জন্য তিনি সমাজ কমিটির সভাপতি সিকান্দর আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
বাদীর অভিযোগ, সামাজিকভাবে বিষয়টি মীমাংসা করে দেওয়ার আশ্বাস দেন সিকান্দর আলী। পরে ঘটনার দিন মোবাইল ফোনে তাকে কল করে বিচারের বিষয়ে বৈঠকের কথা বলে কক্সবাজার শহরে আসতে বলেন।
এ সময় একা আসতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করায় পারভীন আক্তার আরও দুই নারীকে সঙ্গে নিয়ে বিজিবি ক্যাম্প এলাকায় আসেন বলে মামলার দরখাস্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, বিজিবি ক্যাম্প এলাকায় পৌঁছানোর পর সিকান্দর আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন ওই নারী। পরে তিনি তাদের টমটমে করে বাস টার্মিনাল এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় নিয়ে যান। সেখানে তাদের খাবার খাওয়ানো হয়।
এরপর রেস্তোরাঁয় বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব নয়—এমন কথা বলে সিকান্দর আলী বাদীর সঙ্গে থাকা দুই নারীকে হোটেলের নিচে বসিয়ে রাখেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরে বাদী পারভীন আক্তারকে একা নিয়ে একটি আবাসিক হোটেলের ৪০৩ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করেন সিকান্দর আলী—মামলার দরখাস্তে এমনটাই দাবি করা হয়েছে।
বাদীর অভিযোগ, হোটেলকক্ষে যাওয়ার পর সামাজিক বিরোধের বিষয়ে কোনো আলোচনা না করে সিকান্দর আলী তার প্রতি যৌন উদ্দেশ্য প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ সময় তিনি বাধা দেন এবং নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করে কক্ষ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন বলে মামলার দরখাস্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও পারভীন আক্তার হোটেল থেকে ফিরে না আসায় সঙ্গে থাকা দুই নারী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে তারা হোটেলে থাকা দুই অপরিচিত ব্যক্তিকে জানান বলে মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে।
পরে ওই দুই ব্যক্তি ৪০৩ নম্বর কক্ষে যান। সেখানে বাদীকে বিপদগ্রস্ত অবস্থায় দেখতে পান এবং তাকে সেখান থেকে বের করে আনেন বলে আদালতে দেওয়া দরখাস্তে দাবি করা হয়েছে।
তবে ওই দুই ব্যক্তির পরিচয়, তাদের বক্তব্য এবং ঘটনার অন্যান্য পারিপার্শ্বিক বিষয় তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়ার কথা রয়েছে।
সামাজিকভাবেও সমাধানের চেষ্টা, পরে আদালতে
মামলার দরখাস্তে আরও বলা হয়েছে, ঘটনার পর বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পরে বাদী স্বামী সমাজের প্রতিনিধিদের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। কিন্তু সেখানে কোনো সমাধান না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত আদালতের শরণাপন্ন হন তিনি।
ফৌজদারী দরখাস্তে একমাত্র আসামি করা হয়েছে সিকান্দর আলী (৪৮)-কে। তিনি খুরুশকুল ইউনিয়নের রুচ্ছুলার ডেইল এলাকার বাসিন্দা এবং স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে মামলার দরখাস্তে পরিচয় দেওয়া হয়েছে।
মামলাটির সূত্র হিসেবে আদালতের নথিতে সিপি মামলা নং-১১৬/২০২৪ ইংরেজি উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার দরখাস্তে বাদীসহ মোট চারজন সাক্ষীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন—
১. পারভীন আক্তার—বাদীনি।
২. আনোয়ার বেগম (৩৮)—স্বামী মো. রফিক, বিজিবি ক্যাম্প, সিকদার পাড়া, ৬ নম্বর ওয়ার্ড, কক্সবাজার পৌরসভা।
৩. লিজা মনি (১৮)—পিতা আনোয়ার হোসেন, পাহাড়তলী, ২ নম্বর ওয়ার্ড, কক্সবাজার পৌরসভা।
৪. শাহজাহান (৪৪)—পিতা সৈয়দ আলী।
ঘটনার প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য আলামত তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার সুযোগ রয়েছে।
মামলাটি আমলে নিয়ে অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছেন কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১। ফলে এখন তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা, ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই হওয়ার কথা।
অভিযোগের বিষয়ে সিকান্দর আলীর বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
স্থানীয়দের মতে, সামাজিক বিরোধ মীমাংসার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ উঠলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং সত্যতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।