বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২২ পূর্বাহ্ন
রিয়াজ উদ্দিন, কক্সবাজার:
দিনের আলোয় হাজারো পর্যটকের উচ্ছ্বাস। ঢেউয়ের সঙ্গে ছুটে চলা, ছবি তোলা আর সমুদ্রের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়ার দৃশ্য। অথচ রাত নামলেই সেই একই সৈকতের বুকেই নেমে আসে অন্য এক চিত্র—গোপনে চলে বালু উত্তোলন। আর এই বালু লুটের পরিণতিতে সৈকতের বুকজুড়ে তৈরি হচ্ছে গভীর গর্ত, গুপ্তখাল ও চোরাবালি। পর্যটকদের অজান্তেই এসব স্থান হয়ে উঠছে ভয়ংকর ‘মৃত্যুফাঁদ’। পরিবেশবাদীদের হিসাবে, গত ১৮ বছরে কক্সবাজার সৈকতের এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৩১ পর্যটক। সম্প্রতি কলাতলী পয়েন্টের ভাঙ্গার মোড়সংলগ্ন এলাকায় রাতের আঁধারে পাইপলাইন ও বিশেষ মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলনের ঘটনা সামনে আসে। গত ৭ আগস্ট রাত ১টার দিকে সেখানে অভিযান চালায় জেলা প্রশাসনের পর্যটন শাখা। প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে সংশ্লিষ্টরা পালিয়ে গেলেও ঘটনাস্থল থেকে বালু উত্তোলনের মেশিন, বড় পাইপ ও জিওব্যাগ জব্দ করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এভাবে দীর্ঘদিন ধরে সৈকতের বিভিন্ন স্থান থেকে বালু তুলে নেওয়ায় তলদেশের স্বাভাবিক গঠন বদলে যাচ্ছে। কোথাও তৈরি হচ্ছে গভীর গর্ত, কোথাও আবার সৃষ্টি হচ্ছে চোরাবালি। ফলে পানিতে নামা পর্যটকরা বুঝতেই পারছেন না—কোন জায়গাটি নিরাপদ আর কোনটি বিপজ্জনক।
শুধু অবৈধ বালু উত্তোলনই নয়, সৈকতের ভাঙন ঠেকাতে নির্মিত জিওটিউব বাঁধ নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। ২০২০ সাল থেকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে এসব বাঁধ নির্মাণ করা হলেও অভিযোগ উঠেছে, বাঁধ তৈরির জন্য কাছাকাছি সৈকত থেকেই বালু সংগ্রহ করা হয়েছে। পরিবেশবাদীদের দাবি, কোথাও কোথাও বাঁধের মাত্র ১০ থেকে ১৫ ফুট দূর থেকে মেশিনে বালু তোলা হয়েছে।
‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’—ধরা কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরীর দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলন ও বাঁধ নির্মাণের অনিয়মের কারণে সৈকতের বিভিন্ন অংশে ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা তৈরি হয়েছে। তার হিসাবে, গত ১৮ বছরে গুপ্তখাল ও চোরাবালিতে অন্তত ১৩১ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে।
সৈকত রক্ষায় নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান চালানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে সেখানে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, ব্যারিকেড ও পর্যটক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেছেন, সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলন অত্যন্ত ভয়াবহ। এতে সৈকতের স্বাভাবিক গঠন ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুফাঁদ তৈরি হতে পারে। অভিযোগ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সৈকত থেকে কোনোভাবেই অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করতে দেওয়া হবে না।
প্রশ্ন এখন একটাই—পর্যটকের নিরাপত্তার জন্য বিখ্যাত যে সৈকত, সেই সৈকতের বুকেই যদি তৈরি হয় মৃত্যুফাঁদ, তাহলে দায় নেবে কে?