শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৫ পূর্বাহ্ন
রিয়াজ উদ্দিন, কক্সবাজার
দীর্ঘ নয় মাসের বিরতি শেষে আবারও পর্যটকদের জন্য খুলছে দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিন। আগামী ১ নভেম্বর থেকে দ্বীপে পর্যটক ভ্রমণের সুযোগ তৈরি হওয়ায় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ফিরেছে নতুন আশার আলো। তবে পর্যটনের এই প্রত্যাবর্তনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দ্বীপের নাজুক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা। পর্যটকের পদচারণায় অর্থনীতি সচল হবে, নাকি অতিরিক্ত চাপের মুখে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে দ্বীপের প্রকৃতি—এ প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।
নীল জলরাশি, প্রবালপাথর, সারি সারি নারকেলগাছ আর সমুদ্রের অপরূপ সৌন্দর্য সেন্টমার্টিনকে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করেছে। প্রতিবছর শীত মৌসুমে হাজারো পর্যটক ছুটে যান এই দ্বীপে। পর্যটনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের জীবিকা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যবসা গড়ে উঠেছে। ফলে পর্যটন বন্ধ থাকলে যেমন স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ে, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন দ্বীপটির পরিবেশের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ, প্লাস্টিক বর্জ্য, প্রবাল ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং অপরিকল্পিত পর্যটন কার্যক্রমের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই সেন্টমার্টিনের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা নয় মাস পর্যটক ভ্রমণ বন্ধ রাখা হয়। সেই বিরতি শেষে দ্বীপ খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তে পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও পরিবেশকর্মীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিধিনিষেধের কার্যকর বাস্তবায়ন।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে পর্যটক ভ্রমণের সুযোগ থাকবে। নভেম্বর মাসে পর্যটকেরা শুধু দিনের বেলায় দ্বীপ ঘুরে একই দিনে ফিরে আসতে পারবেন। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে রাতযাপনের অনুমতি থাকবে। তবে ফেব্রুয়ারি মাসে পর্যটক ভ্রমণ বন্ধ রাখার নির্দেশনা রয়েছে। নতুন নির্দেশনায় প্রতিদিন গড়ে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্যটকপ্রতি ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দেওয়ার বিধান রয়েছে। পর্যটকদের অনুমোদিত পর্যটকবাহী জাহাজে যাতায়াত এবং নির্ধারিত নিয়ম মেনে টিকিট সংগ্রহ করতে হবে।
তবে পর্যটকদের দৈনিক সংখ্যা, রাতযাপনের সময়সীমা ও জাহাজ চলাচলের কিছু বিষয় পুনর্বিবেচনার উদ্যোগের কথা জানা গেছে। এসব বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। ফলে ভ্রমণের পরিকল্পনা করার আগে পর্যটকদের সর্বশেষ সরকারি নির্দেশনা জেনে নেওয়া জরুরি।
সেন্টমার্টিন কেবল ভ্রমণের জায়গা নয়, এটি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। প্রবাল, সামুদ্রিক কচ্ছপ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর অস্তিত্ব দ্বীপটির পরিবেশগত গুরুত্ব বাড়িয়েছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সুপেয় পানির ব্যবহার, জ্বালানি ও বিদ্যুতের চাহিদা এবং সৈকতের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা না গেলে পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। তাই পর্যটনের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি দ্বীপের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিবেশ রক্ষায় পর্যটকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার এড়িয়ে চলা, যত্রতত্র ময়লা না ফেলা, প্রবাল সংগ্রহ না করা এবং সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাতে অতিরিক্ত আলো, উচ্চ শব্দ এবং পরিবেশের ক্ষতি করে এমন আয়োজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। শুধু সরকারি বিধিনিষেধ জারি করলেই হবে না, সেগুলোর বাস্তবায়নে প্রশাসনের নজরদারি ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের সহযোগিতাও নিশ্চিত করতে হবে।
পর্যটন মৌসুম শুরু হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্যই এর প্রধান সম্পদ। সেই সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য নষ্ট হলে দীর্ঘমেয়াদে পর্যটনশিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই দ্বীপটি খুলে দেওয়ার সাফল্য শুধু কতজন পর্যটক ভ্রমণ করলেন, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না; বরং পর্যটন মৌসুম শেষে দ্বীপের প্রবাল, সৈকত ও জীববৈচিত্র্য কতটা সুরক্ষিত থাকল, সেটিই হবে প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।