রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৯ পূর্বাহ্ন
সোলতান আহমদ নিজস্ব প্রতিবেদক,
কক্সবাজারের টেকনাফ শুধু সমুদ্র ও নাফ নদীর জন্য নয়, পাহাড়, বন ও বন্যপ্রাণীর বৈচিত্র্যের কারণেও দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অঞ্চল। এই প্রাকৃতিক সম্পদের অন্যতম আকর্ষণ দমদমিয়া এলাকার টেকনাফ নেচার পার্ক, যা টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বিস্তৃত বনাঞ্চলের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
দমদমিয়ার সবুজ পাহাড়, বনপথ, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর বিচরণ পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
একই সঙ্গে এলাকাটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এলাকার অংশ হওয়ায় এখানে পর্যটন ও সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি।
প্রায় ২৮ হাজার ৭০০ একরের বিশাল অভয়ারণ্য
বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের আয়তন ১১ হাজার ৬১৫ হেক্টর, যা প্রায় ২৮ হাজার ৭০০ একরের সমান।
পাহাড়ি বনভূমি নিয়ে গঠিত এই অভয়ারণ্য ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় রয়েছে হোয়াইক্যং, শিলখালী ও টেকনাফসহ বিভিন্ন বন বিট।
সমুদ্র ও নাফ নদীর মধ্যবর্তী পাহাড়ি এই বনাঞ্চল টেকনাফের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
হাতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল
টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এশীয় হাতি। বন অধিদপ্তরের সংরক্ষিত এলাকার নথিতে এ অঞ্চলে হাতির উপস্থিতি এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
এছাড়া টেকনাফ উপদ্বীপে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর উপস্থিতির তথ্য রয়েছে। পাহাড়ি চিরসবুজ ও আধা-চিরসবুজ বন, ঝোপঝাড় ও জলাধার মিলে এখানে একটি বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র তৈরি হয়েছে।
পর্যটনের অপার সম্ভাবনা
দমদমিয়া নেচার পার্ককে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত ইকোট্যুরিজমের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বনাঞ্চলের প্রকৃতি, পাহাড়ি পথ ও বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণের সুযোগ পর্যটকদের জন্য আলাদা আকর্ষণ তৈরি করতে পারে।
টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের ব্যবস্থাপনায় বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ৬টি নেচার ট্রেইল, তথ্যকেন্দ্র, কো-ম্যানেজমেন্ট কমিটির কার্যালয় এবং অন্যান্য পর্যটন অবকাঠামো রয়েছে।
স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে ইকোট্যুরিজমের বিকাশ ঘটানো গেলে একদিকে পর্যটন বাড়বে, অন্যদিকে বন সংরক্ষণে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণও শক্তিশালী হতে পারে।
বন সংরক্ষণে বড় চ্যালেঞ্জ
তবে বিশাল সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে নানা সংকট। বন অধিদপ্তরের সংরক্ষিত এলাকার প্রোফাইলে ভূমি দখল, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ব্যবহার এবং বনজ সম্পদ আহরণকে ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুরোনো একটি বন অধিদপ্তর-সমর্থিত প্রোফাইলে আরও উল্লেখ করা হয়েছিল, টেকনাফের প্রাকৃতিক বনভূমির বড় অংশ বিভিন্ন সময়ে অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে এবং কিছু এলাকায় বসতি ও কৃষিকাজের জন্য বনভূমি ব্যবহারের চাপ তৈরি হয়েছে।
ফলে নেচার পার্ককে ঘিরে পর্যটন সম্প্রসারণের সময় বন, পাহাড়, বন্যপ্রাণী ও স্থানীয় পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না হয়—সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।
অবকাঠামো আছে, প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থাপনা
সরকারি নথিতে টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে রেঞ্জ অফিস, বিট অফিস, নার্সারি, তথ্যকেন্দ্র, কো-ম্যানেজমেন্ট অফিস, নেচার ট্রেইল, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর উল্লেখ রয়েছে।
তবে পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়ন শুধু স্থাপনা নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিরাপদ ট্রেইল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যটক নিয়ন্ত্রণ, বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা এবং বন রক্ষায় নিয়মিত নজরদারির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার দাবি রয়েছে।
স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার ওপর জোর
টেকনাফের বন সংরক্ষণে কো-ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বন সংরক্ষণ, বিকল্প আয়ের সুযোগ এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে বননির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় মানুষকে বাদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বন সংরক্ষণ কঠিন। তাই নেচার পার্ককে কেন্দ্র করে স্থানীয় তরুণদের গাইড, পরিবেশকর্মী ও পর্যটনসেবার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড—দুই ক্ষেত্রেই সুফল আসতে পারে।
প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট মাস্টারপ্ল্যান
টেকনাফ নেচার পার্ককে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্রে রূপ দিতে হলে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রয়োজন। সেখানে নির্দিষ্ট পর্যটন জোন, সংরক্ষিত এলাকা, বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে বনভূমি দখল, অবৈধ স্থাপনা ও বনজ সম্পদ আহরণের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর দাবি
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়ি বন, নাফ নদী ও সমুদ্রের নৈকট্য-সব মিলিয়ে টেকনাফ নেচার পার্ক হতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ইকোট্যুরিজম স্পট। তবে উন্নয়নের নামে যদি বন ও বন্যপ্রাণীর ওপর চাপ বাড়ে, তাহলে সেই উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
তাই পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি স্থানীয়দের। একই সঙ্গে দমদমিয়া নেচার পার্কের বর্তমান অবস্থা, সরকারি সম্পত্তির সীমানা, অবকাঠামো, পর্যটক ব্যবস্থাপনা ও বন সংরক্ষণ কার্যক্রম নিয়ে নিয়মিত পরিদর্শন ও জনসম্মুখে তথ্য প্রকাশেরও দাবি উঠেছে।
প্রকৃতি বাঁচলে পর্যটন বাঁচবে-আর টেকনাফের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করতে পারলেই নেচার পার্কটি হয়ে উঠতে পারে উপকূলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র।