সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
পিএমখালীতে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন নেতার ওপর হামলা, ২ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ কক্সবাজারের সর্ববৃহৎ খরুলিয়া বাজারে লাইটিং, সিসি ক্যামেরাসহ উন্নয়ন উদ্যোগ কক্সবাজারে ৬২ ইউপিতে ভোট, তফসিল চলতি মাসেই ফেনীর ৪ তরুণ অপহরণ মামলার আসামি জাহাঙ্গীর টেকনাফে গ্রেপ্তার রামুতে কিশোরীকে মারধর ও শ্লীলতাহানির অভিযোগ, বাবাকে দা দিয়ে কোপ টেকনাফ মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে এসএসসি-২০২৬-এর ৭ কৃতী শিক্ষার্থী ও সফল অভিভাবকদের রাজকীয় সংবর্ধনা কক্সবাজারে পুলিশের বিশেষ অভিযান: চোর-ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীসহ গ্রেপ্তার ২২ কক্সবাজারে ইকরাম হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার উখিয়ায় অপহরণের পর ফেরিওয়ালা উদ্ধার, মুক্তিপণ দাবি ১০ লাখ টাকা খুরুশকুল নতুন ব্রিজে পুলিশের অভিযান: দেশীয় অস্ত্রসহ ৪ ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার

ধারণ ক্ষমতার তিনগুণ বন্দি কক্সবাজার কারাগারে

প্রতিবেদকের নাম / ৭৬ বার পড়া হয়েছে
আপডেট সময় : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ পূর্বাহ্ন

সোলতান আহমদ নিজস্ব প্রতিবেদক

কক্সবাজার জেলা কারাগারে ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি বন্দি থাকায় আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও কারাব্যবস্থাপনা নিয়ে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮৫০ জন ধারণক্ষমতার এই কারাগারে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৬০০ বন্দি রয়েছেন।

অর্থাৎ কারাগারটিতে ধারণক্ষমতার তিনগুণেরও বেশি বন্দি অবস্থান করছেন।

শুধু কক্সবাজার নয়, অতিরিক্ত বন্দির চাপ দেশের কারাগারব্যবস্থারও একটি বড় সমস্যা। চলতি বছরের জুনে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশের ৭৫টি কারাগারে ধারণক্ষমতার প্রায় ১ দশমিক ৭ গুণ বন্দি আটক রয়েছেন।

কেন বাড়ছে কারাগারে বন্দির চাপ?
সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘসূত্রতায় বিচারাধীন মামলা, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগা, জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা এবং বিপুলসংখ্যক মাদক ও অন্যান্য মামলার আসামি কারাগারে থাকার কারণে বন্দির সংখ্যা বাড়ছে।

কক্সবাজারের ভৌগোলিক অবস্থান, সীমান্ত ও রোহিঙ্গা সংকটের কারণেও কারাগারটির ওপর বাড়তি চাপ রয়েছে।

বর্তমানে কক্সবাজার জেলা কারাগারে প্রায় ৪৫০ জন রোহিঙ্গা, মিয়ানমারের নাগরিক, ভারতীয়সহ বিভিন্ন দেশের বিদেশি বন্দি রয়েছেন। কারাগারের মোট বন্দির প্রায় ১৭ শতাংশই বিদেশি নাগরিক। ফলে সাধারণ বন্দিদের পাশাপাশি বিদেশি ও রোহিঙ্গা বন্দিদের ব্যবস্থাপনাও কারা কর্তৃপক্ষের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শুধু নতুন ভবন নয়, প্রয়োজন সমন্বিত সমাধান
কারা সংকট নিরসনে শুধু নতুন কারাগার নির্মাণই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কারণ, অপরাধ, মামলা ও গ্রেফতারের হার বাড়তে থাকলে নতুন কারাগারও একসময় একই সংকটে পড়তে পারে। তাই সমস্যার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

নির্বিচারে গ্রেফতার নয়
আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ছোটখাটো বা কম গুরুতর অভিযোগে যেখানে আইনগতভাবে গ্রেফতার অপরিহার্য নয়, সেখানে বিকল্প আইনি ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে এর অর্থ কোনোভাবেই গুরুতর অপরাধীকে ছাড় দেওয়া নয়। হত্যা, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, মাদক পাচার, মানবপাচারসহ জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে।

যোগ্য আসামির ন্যায়সংগত জামিন
যেসব আসামি আইন অনুযায়ী জামিন পাওয়ার যোগ্য, তাদের ক্ষেত্রে জামিনপ্রক্রিয়া অযথা দীর্ঘ না করে দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

শুধু আর্থিক অসচ্ছলতা বা আইনি সহায়তার অভাবে কোনো ব্যক্তি যেন বছরের পর বছর বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে না থাকেন, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

দ্রুত তদন্ত ও দ্রুত বিচার
কারাগারে অতিরিক্ত বন্দির চাপ কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায় হলো মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা।

দীর্ঘদিন তদন্ত শেষ না হওয়া, সাক্ষ্যগ্রহণে বিলম্ব এবং একের পর এক সময় প্রার্থনার কারণে অনেক বিচারাধীন আসামিকে দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকতে হয়।

এ ক্ষেত্রে মামলার ধরন অনুযায়ী দ্রুত তদন্ত, ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট, পর্যাপ্ত বিচারক ও প্রসিকিউটর নিয়োগ এবং গুরুতর মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

কারাবাসের বিকল্প ব্যবস্থা
কম গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আইনসম্মতভাবে প্রবেশন, জরিমানা, সমাজসেবামূলক কাজ, পুনর্বাসন এবং অন্যান্য কারাবাস-বহির্ভূত ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।
এতে কারাগারের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পরিবার ও সমাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না করেও আইনগত শাস্তি ও সংশোধনের সুযোগ তৈরি হবে।

মাদক মামলায় আলাদা কৌশল
সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় কক্সবাজারে মাদক মামলার চাপ তুলনামূলক বেশি। শুধু মাদক মামলার আসামির সংখ্যা বাড়লে কারাগারের ওপরও চাপ বাড়বে। তাই খুচরা পর্যায়ের অপরাধীদের পাশাপাশি মাদক চোরাচালান চক্রের মূল হোতা, অর্থদাতা ও সীমান্তভিত্তিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

একই সঙ্গে মাদকাসক্ত ও চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে-এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী চিকিৎসা ও পুনর্বাসনভিত্তিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

আলাদা বন্দিশালা ও আধুনিক কারাগারের ভাবনা
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ও বিদেশি বন্দিদের জন্য পৃথক বন্দিশালা নির্মাণের প্রস্তাবও এসেছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম অঞ্চলের কারাগারগুলোর অতিরিক্ত চাপ কমাতে নতুন কারাগার নির্মাণের বিষয়েও কারা কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব রয়েছে।

পৃথক অবকাঠামো তৈরি হলে বিভিন্ন শ্রেণির বন্দিদের ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা আরও কার্যকর হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

কারাগারকে যুগোপযোগী করতে পর্যাপ্ত আবাসন, আধুনিক চিকিৎসাসেবা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং বন্দিদের অপরাধের ধরন অনুযায়ী পৃথক রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

মানবিক ও নিরাপদ কারা ব্যবস্থাপনার দাবি
ধারণক্ষমতার তিনগুণ বন্দি একটি কারাগারে থাকলে শুধু বন্দিরাই নন, কারারক্ষী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বাড়তি চাপের মুখে পড়েন।

এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি, নিরাপত্তা সমস্যা এবং বন্দিদের সংশোধন ও পুনর্বাসনমূলক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কারাগারকে শুধু মানুষ আটকে রাখার স্থান হিসেবে দেখলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
কারাগারকে এমন একটি সংশোধন ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে পরিণত করতে হবে, যেখানে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি শাস্তি ভোগের পাশাপাশি দক্ষতা অর্জন করে সমাজে ফিরে স্বাভাবিক জীবনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান।

কী বলছে বাস্তবতা?
কক্সবাজার জেলা কারাগারের বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে-সমস্যার সমাধান কোনো একটি পদক্ষেপে সম্ভব নয়।

নির্বিচারে গ্রেফতার বন্ধ, আইন অনুযায়ী যোগ্য ব্যক্তিদের জামিন, দ্রুত তদন্ত ও বিচার, কারাবাসের বিকল্প ব্যবস্থা, মাদক ও পুনর্বাসন নীতির কার্যকর প্রয়োগ এবং কারাগারের আধুনিকায়ন-সবগুলো পদক্ষেপ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে।

কারা সংকটকে শুধু নতুন ভবন নির্মাণের বিষয় হিসেবে না দেখে বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা ও পুনর্বাসনের একটি সমন্বিত সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে।
নইলে বন্দির সংখ্যা বাড়তেই থাকবে, আর ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মানুষ নিয়ে কক্সবাজার জেলা কারাগারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিনিয়ত আরও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


error: Content is protected !!
error: Content is protected !!